উলম্ব কৃষিঃ বাংলাদেশে কৃষির ভবিষ্যৎ
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৭.১০ কোটি মানুষের বসবাস (অর্থনৈতিক সমীক্ষা–২০২৪)। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান হারের সঙ্গে সঙ্গে আবাদযোগ্য ৮৮.২৯ লাখ হেক্টর (কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ–২০২৩) জমির পরিমাণ দিন দিন কমছে।
এভাবে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমতে থাকলে একসময় এ দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়বে। ভবিষ্যতের খাদ্য সরবরাহ ঠিক রাখার জন্য কৃষির আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। সে ক্ষেত্রে অল্প জায়গায় অধিক চাষাবাদের জন্য উলম্ব কৃষি একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
উলম্ব কৃষি হলো একটি সৃজনশীল ও ব্যবহারিক কৃষি পদ্ধতি, যেখানে নিয়ন্ত্রিত আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, সার ব্যবস্থাপনা, বালাই ব্যবস্থাপনা ও পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অতি অল্প স্থানে অধিক ফসল উৎপাদন করা যায়। এই প্রযুক্তিকে অন্দরমহল কৃষি (Indoor Farming)-ও বলা হয়।
কৃষির ভবিষ্যৎ হিসেবে কেন উলম্ব কৃষি?
আবাদযোগ্য কৃষিজমির অপর্যাপ্ততার কারণে আধুনিক বিশ্বের অনেক দেশ—যেমন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো—ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া এশিয়া মহাদেশের দেশ চীন, জাপান, কোরিয়া এমনকি ভারতেও এই প্রযুক্তির ব্যবহারে চাষাবাদ শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ, যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় ১.৩৩% এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ১,১৭১ জন প্রতি বর্গকিলোমিটার। এমনকি ঢাকা শহরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ২,১৫৬ জন বসবাস করে (অর্থনৈতিক সমীক্ষা–২০২৪)।
এটি সহজেই অনুমেয় যে ভবিষ্যতে বিপুল খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিটি গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও শহর পর্যায়ে—বিশেষত জনবহুল শহরের ছাদ, অব্যবহৃত স্থান ও বারান্দা, শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের ছাদ ও অব্যবহৃত আঙিনা, অব্যবহৃত কৃষিজমি, উপকূলীয় এলাকা, হাওর ও দ্বীপ এলাকায়—এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
জমির পরিমাণ কম এবং অন্যান্য দেশের তুলনায় জমির মূল্য বেশি হওয়ায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে উলম্ব কৃষি একটি কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা হতে পারে।
উপযুক্ত ফসল
টমেটো, বেগুন, লেটুস
, ব্রোকলি, পুদিনা, ধনেপাতা,
লালশাক, মরিচ, স্ট্রবেরি, মাশরুমসহ বিভিন্ন ধরনের সবুজ পা
তাযুক্ত সবজি উলম্ব কৃষিতে চাষের জন্য উপযোগী।
সুবিধা
প্রথমত,
পরিমাণগত দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, দেশে প্রচলিত গতানুগতিক খামারে উৎপন্ন ফসলের তুলনায় উলম্ব কৃষি পদ্ধতিতে উৎপন্ন ফসলের পরিমাণ বহুগুণ বেশি হতে পারে। ফসলের প্রকৃতি ভেদে উৎপাদন ৪–৬ গু
ণ বা ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়েও বেশি হতে পারে। ফলে বর্ধিত খাদ্য চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।
দ্বিতীয়ত,
সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উৎপাদন করা হয় বলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে উলম্ব কৃষি ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। অথচ খরা, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, বন্যা,
ঝড়, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতির কারণে প্রতিবছরই প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
তৃতীয়ত,
উলম্ব কৃষিতে সারা বছরব্যাপী চাষাবাদ করা যায়। ফলে প্রচলিত কৃষির মতো মৌসুম শেষে শ্রমিকদের কাজের অভাব হয় না। বরং সারা বছর কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব।
চতুর্থত,
গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও জনবহুল শহর পর্যায়ে উলম্ব কৃষির কার্যক্রম শুরু করা হলে কাজের অভাবে গ্রামগঞ্জ থেকে মানুষকে কাজের জন্য শহরে ছুটে যেতে হবে না। এ
র ফলে শহরে মানুষের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।
পঞ্চমত,
উলম্ব কৃষি পদ্ধতিতে তুলনামূলকভাবে খুব কম কৃষিজমি ও বনভূমি ধ্বংস হয়।
ষষ্ঠত,
ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ও বন্যপ্রাণীর মাধ্যমে ফসল ধ্বংসের পরিমাণ উলম্ব কৃষিতে তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
সর্বশেষে,
প্রচলিত কৃষির তুলনায় কম জমি, কম পানি এবং কম রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব। এটি প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চ্যালেঞ্জ
যদিও উলম্ব কৃষি একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি, তবুও এর বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিয়ে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রথমত,
উলম্ব কৃষিতে প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং বিশেষ সেচ ব্যবস্থার জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগের খরচ বেশি হয়। ফলে অনেক সময় ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য এটি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয়ত,
এটি পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট ধরনের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োজন। সাধারণ কৃষকরা এ ধরনের প্রযুক্তি পরিচালনায় অভ্যস্ত নাও হতে পারেন। ফলে তাদের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
তৃতীয়ত,
সব ধরনের ফসল এই পদ্ধতিতে সফলভাবে চাষ করা যায় না। কিছু শাকসবজি, ফল ও মসলা জাতীয় ফসলের জন্য এটি উপযোগী হলেও বড় আকারের ফসল বা বড় গাছের জন্য এটি উপযুক্ত নয়। ফলে বাণিজ্যিকভাবে এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সর্বশেষে,
প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেচ ব্যবস্থা বা বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো ত্রুটি ঘটলে গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারের করণীয়
এই পদ্ধতির সফল বাস্তবায়ন ও প্রসারের জন্য সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যেমন—
- প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সহজলভ্যতায় সহায়তা করা;
- আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান করা;
- কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা;
- সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি করা;
- আধুনিক কৃষি অবকাঠামো তৈরি করা;
- বাজারজাতকরণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা;
- আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা;
- জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে উৎসাহিত করা।
এই প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে এবং এটি দেশকে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তাই উলম্ব কৃষির প্রতি
আমাদের আগ্রহ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা উচিত, যাতে বাংলাদেশ একটি সবুজ, টেকসই ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

Nafisa Tabassum Joya



Leave a Comment