মাশরুম চাষ: একটি লাভজনক ও সম্ভাবনাময় কৃষি উদ্যোগ

মাশরুম একটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু খাবার, যা সাধারণ সবজির মতো মাটিতে জন্মায় না। এটি এক ধরনের নিম্নশ্রেণির ছত্রাকজাতীয় উদ্ভিদ, যা জৈবিক বস্তু থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। বাংলাদেশে আশির দশকের শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে মাশরুম চাষ শুরু হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে সাভা

রে দুটি কালচার সেন্টার স্থাপন করা হয়, যেখানে মাশরুমের বীজ (স্পন) উৎপাদন ও বিতরণ করা হতো। বর্তমানে, মাশরুম উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এই কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। মাশরুম চাষ হলো কৃষির একটি বিশেষ শাখা, যা স্বল্প জায়গায়, অল্প মূলধনে ও সহজ পরিচর্যায় লাভজনকভাবে পরিচালনা করা যায়। এটি শুধু পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা মেটায় না, বরং বেকারত্ব দূরীকরণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মাশরুমের পুষ্টিগুণ:

মাশরুম উচ্চমাত্রার পুষ্টিগুণসম্পন্ন একটি খাদ্য যা প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ ও আঁশের ভালো উৎস। প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনো মাশরুমে ২৫-৩৫% প্রোটিন থাকে, যা একে “সবজি মাংস” হিসেবে পরিচিত করেছে। নিচে প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনো মাশরুমের পুষ্টিগুণ একটি ছকের মাধ্যমে দেওয়া হলো-

পুষ্টিগুণ PDF পরিমাণ PDF পুষ্টিগুণ PDF পরিমাণ PDF

শক্তি (ক্যালোরি)

২৮০-৩০০ ক্যালোরি

পটাশিয়াম

১৫০০-২০০০ মি.গ্রা.

প্রোটিন

২৫-৩৫ গ্রাম

সোডিয়াম

১০-৫০ মি.গ্রা.

ফ্যাট (চর্বি)

২-৪ গ্রাম

ভিটামিন বি১ (থায়ামিন)

০.১-০.৩ মি.গ্রা.

কার্বোহাইড্রেট

৩০-৪০ গ্রাম

ভিটামিন বি২ (রিবোফ্লাভিন)

২-৪মি.গ্রা.

ফাইবার

২০-২৫ গ্রাম

ভিটামিন বি৩ (নিয়াসিন)

২০-৩০ মি.গ্রা.

ক্যালসিয়াম

১০-২০ মি.গ্রা.

ভিটামিন ডি

৩০-২০০ মাইক্রোগ্রাম

আয়রন

৫-১২ মি.গ্রা.

জিঙ্ক

৬-৮ মি.গ্রা.

মাশরুমের ঔষধিগুণ ও ব্যবহার:

মাশরুমের ঔষধিগুণ অসংখ্য। এটি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়ক। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং টিউমার কোষ বৃদ্ধির বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

  • নিয়মিত মাশরুম খেলে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়, শারীরিক ও মানসিক শক্তি বাড়ে এবং ঠান্ডা-সর্দি প্রতিরোধে সাহায্য করে।

  • এতে থাকা ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং ত্বকের জন্যও উপকারী।

  • এটি কম কার্বোহাইড্রেটযুক্ত হওয়ায় ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আদর্শ খাবার।

  • এছাড়া এতে প্রচুর আঁশ থাকায় এটি হজমে সহায়তা করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

  • খাদ্য ছাড়াও মাশরুম বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়, যেমন ছবির ফ্রেম, ফুলদানি, বোতলের কর্ক এবং বিভিন্ন শৈল্পিক সামগ্রী তৈরিতে।

বাংলাদেশে চাষযোগ্য মাশরুমের জাত:

বিশ্বে হাজারো জাতের মাশরুম থাকলেও বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ৮-১০টি জাত বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- ১. ঝিনুক মাশরুম (Oyster mushroom) ২. বোতাম মাশরুম (Button mushroom) ৩. দুধ মাশরুম (Milky mushroom) ৪. তাপ সহনশীল বোতাম মাশরুম (Heat tolerate button mushroom) ৫. শিটাকি মাশরুম (Shitake mushroom) ৬. খড় মাশরুম (Paddy straw mushroom) ৭. কান মাশরুম (Wood ear mushroom)

ঝিনুক মাশরুম চাষ পদ্ধতি:

বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ঝিনুক মাশরুমের চাষ বেশ জনপ্রিয়। চাষের জন্য স্পনযুক্ত সাবস্ট্রেটসহ প্রস্তুত পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। সাধারণত একটি ৫০০ গ্রাম ওজনের ব্যাগে নিম্নলিখিত উপকরণ ব্যবহার করা হয়-

  • কাঠের গুঁড়া- ৬৪%

  • গমের ভূষি-৩২%

  • ধানের তুষ-৪%

উপাদানগুলোর সঙ্গে চুন ও পানি মিশিয়ে ব্যাগ তৈরি করা হয়। চাষের জন্য বাঁশের মাচায় ব্যাগগুলো সাজিয়ে রাখতে হয়। চাষের ধাপগুলো হলো- ১. ব্যাগের দুই পাশে আধচন্দ্রাকৃতির ছিদ্র করা হয়। ২. ছিদ্র করা অংশ পরিষ্কার পানিতে ২০-৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখা হয়। ৩. অতিরিক্ত পানি ঝরানোর পর ব্যাগগুলো নির্ধারিত স্থানে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ৪. ব্যাগগুলোর উপর প্রয়োজন হলে পলিথিন ঢেকে রাখা হয় যাতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে। ৫. ব্যাগ থেকে কয়েক দিনের মধ্যে সাদা সুতো সদৃশ অংশ দেখা যায় এবং ধীরে ধীরে মাশরুম বৃদ্ধি পায়। ৬. ৫-৭ দিনের মধ্যে মাশরুম সংগ্রহযোগ্য হয়ে ওঠে। একটি ব্যাগ থেকে ৩-৪ বার মাশরুম সংগ্রহ করা সম্ভব।

মাশরুমের রোগ ও কীটপতঙ্গ দমন:

মাশরুম চাষে পোকা-মাকড়ের সমস্যা দেখা দিতে পারে, বিশেষত মাশরুম মাছি। এটি প্রতিরোধে ০.১% ম্যালাথিয়ন স্প্রে করা যেতে পারে। ফর্মালিনের (৪%) মাধ্যমে সবুজ, বাদামী বা নীল মোল্ড দূর করা যায়।

  • এছাড়া মাশরুমে মাইটস দমনের জন্য সাবান পানি স্প্রে

  •  বা নিম তেল ব্যবহার করা যেতে পারে অথবা গরম বাষ্প প্রয়োগ এবং ভালো বাতাস চলাচল নিশ্চিত করাও এক্ষেত্রে একটি কার্যকর পদ্ধতি।

উপসংহার:

মাশরুম চাষ বাংলাদেশে একটি লাভজনক কৃষি উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে। এটি চাষে খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না, স্বল্প বিনিয়োগে উচ্চ মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। তদুপরি, এটি পুষ্টিকর, ঔষধিগুণসম্পন্ন এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি পণ্য। সঠিক প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে মাশরুম চাষ নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে

 

মৌমিতা ধর

এম.এস. ইন এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন এডুকেশন

ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রোনমি এন্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *